নূর হোসেন: 'শরীরে শ্লোগান লিখেছিলাম আমি, তার মৃত্যুর জন্য আমি নিজেকেই দায়ী ভাবতাম'

নূর হোসেন: 'শরীরে শ্লোগান লিখেছিলাম আমি, তার মৃত্যুর জন্য আমি নিজেকেই দায়ী ভাবতাম'




১০ই নভেম্বর, ১৯৮৭ সাল। প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগ এবং গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সচিবালয় অবরোধের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দলগুলো। অবরুদ্ধ নগরীতে সেদিন রাস্তায় নেমেছিল এক তরুণ, নূর হোসেন। তার বুকে পিঠে স্বৈরতন্ত্রের পতন আর গণতন্ত্রের দাবিতে লেখা শ্লোগান। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার আগে তোলা নূর হোসেনের ছবি পরবর্তীকালে হয়ে উঠে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।


এক শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত পরিবারের এই তরুণ কী ভেবে সেদিন নিজের 
শরীরকে জীবন্ত পোস্টার করে তুলেছিলেন? কে তার শরীরে লিখে দিয়েছিল এই শ্লোগান?

গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে সেদিন ঢাকার শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোলরুমের যে সেলে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেখানে তখন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে আটক ছিলেন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন এই প্রতিবেদনের লেখক, বিবিসির মোয়াজ্জেম হোসেনও।

ছেলেটির সঙ্গে সেরকম কথা হয়নি কখনো ইকরামের, তবে মুখ চেনা। নাম তার নূর হোসেন।

"নূর হোসেন যখন আসলো, আমি তখন আমার কাজ শেষ করছি। নূর হোসেন আমাকে বললো, ইকরাম ভাই, আপনি এমন এক জায়গায় আজকে লিখবেন, যেখানে জীবনেও লেখেন নাই।"

ইকরাম হোসেনের শিল্পী মনে কৌতুহল জাগলো। কী এমন লেখা, যা জীবনে লেখেননি?

অফিস পাড়ায় তখন শীতের সন্ধ্যা নামছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ইকরামকে নিয়ে নূর হোসেন ঢুকে গেলেন এক ছোট্ট গলিতে। তারপর যা করলেন, তাতে হতভম্ব হয়ে গেলেন ইকরাম হোসেন। নূর হোসেন তার গায়ের জামা খুলে ফেললেন এক ঝটকায়।

‍"আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি জামা খুললেন কেন। নূর হোসেন আমাকে বললেন, ইকরাম ভাই, আপনি আমার বুকের এখানে লিখবেন 'স্বৈরাচার নিপাত যাক', আর পিঠে লিখবেন , 'গণতন্ত্র মুক্তি পাক'। আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। আমি তো জীবনেও কোন মানুষের গায়ে লিখিনি। আমি কাউকে কখনো মানুষের গায়ে লিখতে দেখিনি।"

"আমি একটু ভয় পেলাম। আমার বড় ভাই প্রেসিডেন্ট এরশাদের চাপরাশি। আমি থাকি বঙ্গভবনের কোয়ার্টারে। প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে তো আমি এরকম একটা জিনিস লিখতে পারি না। আমি বললাম, না, এটা আমি লিখতে পারবো না। আপনি এটা লিখে বাইরে গেলে পুলিশের মার খাবেন। তারপর জেলে যাবেন। আপনি মরেও যেতে পারেন।"

কিন্তু নূর হোসেন ছিলেন নাছোড়বান্দা।

"নূর হোসেন আমাকে বলেছিল, ইকরাম ভাই আমি একা না, আরও একশো জনের গায়ে এটা লেখা থাকবে। আমরা সবাই কাল এক সঙ্গে মিছিল করবো।"

একটু ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত ইকরাম হোসেন এরপর যা লিখে দিলেন, তা এখন ইতিহাস।

কী লিখতে হবে তা নূর হোসেন নিজেই চক দিয়ে প্রথমে দেয়ালে লিখেছিলেন। সেই লেখা দেখে নূর হোসেনের বুকে আর পিঠে তিনি সাদা রঙে একেঁ দিলেন সেই বিখ্যাত শ্লোগান: স্বৈরাচার নীপাত যাক।। গণতন্ত্র মুক্তি পাক।। যেভাবে ভুল বানানে নূর হোসেন চক দিয়ে দেয়ালে লিখে দিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবে।

তিনি শ্লোগানটি লিখেছিলেন এনামেল পেইন্ট দিয়ে। বুকে-পিঠে দুদিকেই শ্লোগান লিখে শেষে দুটি দাড়ি দিয়েছিলেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ